প্রিন্ট এর তারিখঃ Sep 11, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Aug 16, 2026 ইং
ডিআর কঙ্গোতে ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাব, মৃত্যু ২১৮৪ | Ebola Outbreak

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ১২ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে Bundibugyo virus-এর কারণে সৃষ্ট ইবোলা রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ১২ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত শুধু ডিআর কঙ্গোতেই ৪ হাজার ৬৬৫টি নিশ্চিত আক্রান্তের ঘটনা এবং ২ হাজার ১৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯৬৫ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
WHO-এর হিসাবে, কঙ্গোর এই প্রাদুর্ভাব এখন দেশটির ইতিহাসে নথিভুক্ত সবচেয়ে বড় ইবোলা সংক্রমণ। এর আগে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের বড় ইবোলা প্রাদুর্ভাবে ৩ হাজার ৩১৭টি আক্রান্তের ঘটনা রেকর্ড হয়েছিল। নতুন প্রাদুর্ভাবে সেই সংখ্যা ইতোমধ্যে অনেক ছাড়িয়ে গেছে। WHO বলছে, এবারের সংক্রমণ আগের অনেক প্রাদুর্ভাবের তুলনায় দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশ। ১২ আগস্ট পর্যন্ত দেশের মোট নিশ্চিত রোগীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং মৃত্যুর প্রায় ৭৯ শতাংশ এই প্রদেশে হয়েছে। শুধু একদিনেই ইতুরিতে ৬৭টি নতুন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে WHO। উত্তর কিভু প্রদেশে একই সময়ে আরও ২৫টি নতুন আক্রান্তের ঘটনা পাওয়া গেছে।
এখন পর্যন্ত কঙ্গোর ছয়টি প্রদেশের ৫৪টি স্বাস্থ্য এলাকায় রোগটি শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে Bas-Uélé প্রদেশ। সেখানে Buta Health Zone এলাকায় একটি নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। WHO বলছে, ওই রোগীর ইতুরির সঙ্গে ভ্রমণ-সম্পর্ক ছিল এবং ৪ আগস্ট তার শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়।
পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে কারণ সব আক্রান্ত মানুষকে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক নতুন রোগী এমন ব্যক্তি, যারা আগে থেকে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে থাকা সংস্পর্শের তালিকায় ছিলেন না। ফলে তারা কার কাছ থেকে সংক্রমিত হয়েছেন এবং তাদের মাধ্যমে আর কারা আক্রান্ত হয়েছেন—তা খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সামনেও রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি। WHO জানিয়েছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে চিকিৎসা ও নজরদারির কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ১৭ মে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর থেকে স্বাস্থ্যসেবার ওপর ১২টি হামলার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এর কারণে কোনো কোনো এলাকায় রোগী শনাক্ত করা, নমুনা পরীক্ষা করা এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া কর্মীদের বেতনসংক্রান্ত সমস্যা, ধর্মঘট, ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া এবং যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। সংঘাতের কারণে অনেক মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছেন। স্বর্ণখনি ও বাণিজ্যকেন্দ্রিক মানুষের চলাচলও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন।
ইবোলার এই প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী Bundibugyo virus, যা ইবোলা-সংশ্লিষ্ট Orthoebolavirus গোত্রের একটি ভাইরাস। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ফলখেকো বাদুড়কে এই ভাইরাসের সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে ধরা হয়। তবে আক্রান্ত মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমেও রোগটি ছড়াতে পারে। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং নিরাপদভাবে মৃতদেহ সৎকার করা—সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
এ মুহূর্তে Bundibugyo virus-এর বিরুদ্ধে অনুমোদিত কোনো নির্দিষ্ট টিকা বা চিকিৎসা নেই। তবে নতুন চিকিৎসা ও টিকা নিয়ে গবেষণা চলছে। WHO জানিয়েছে, ২ জুলাই থেকে একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে এবং এতে ইতোমধ্যে ১০০-এর বেশি নিশ্চিত রোগী অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যমান কিছু ইবোলা টিকার সম্ভাব্য সুরক্ষা নিয়ে পরীক্ষাও চলছে।
এই প্রাদুর্ভাবের প্রভাব কঙ্গোর বাইরে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করেছে। প্রতিবেশী উগান্ডায় আক্রান্ত একজন রোগী চিকিৎসা শেষে ১৬ জুলাই সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। তবে কঙ্গোতে চলমান সংক্রমণ এবং সীমান্তপথে মানুষের চলাচলের কারণে উগান্ডাকে এখনো উচ্চ ঝুঁকিতে রাখা হয়েছে। WHO বলছে, কঙ্গোর ঝুঁকি বর্তমানে অত্যন্ত বেশি, আর উগান্ডায় পুনরায় সংক্রমণ ঢোকার আশঙ্কা উচ্চ। একই সঙ্গে কঙ্গোর সঙ্গে স্থলসীমান্ত থাকা অন্য দেশগুলোকেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান মূল্যায়নে আফ্রিকার বাকি অঞ্চল ও বিশ্বব্যাপী ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। সংস্থাটি এখনই আক্রান্ত দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রমণ বা বাণিজ্য বন্ধ করার পরামর্শ দেয়নি। বরং দ্রুত শনাক্তকরণ, সীমান্ত নজরদারি, চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মানুষের মধ্যে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে।
WHO-এর জরুরি কমিটি আগামী ১৮ আগস্ট ২০২৬ আবার বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। সেখানে পরিস্থিতির নতুন মূল্যায়ন এবং পরবর্তী আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। বিশেষজ্ঞদের নজর এখন মূলত সংক্রমণ কত দ্রুত নতুন এলাকায় ছড়াচ্ছে এবং আক্রান্ত মানুষদের কত দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় আনা যাচ্ছে—সেদিকে।
তথ্যসূত্র: World Health Organization (WHO), Associated Press (AP)
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দেশ বাংলা টিভি নিউজ