
আন্তর্জাতিক ডেক্স:-
নেপালে টানা ভারী বৃষ্টির মধ্যে একের পর এক ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় নতুন করে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বন্যা, ভূমিধস ও সংশ্লিষ্ট দুর্যোগে অন্তত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ১৪ জন।
গত কয়েক দিন ধরে চলা অতিবৃষ্টির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে দেশটির গণ্ডকী প্রদেশের বিভিন্ন জেলায়। বাগলুং, মিয়াগদি, পর্বত, মানাং ও পালপাসহ কয়েকটি এলাকায় ভূমিধসের পাশাপাশি নদীভাঙন, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বাগলুংয়েই একাধিক ভূমিধসে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মিয়াগদি জেলাতেও ভূমিধসে প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে কালী গণ্ডকী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় নদীতীরবর্তী জনপদে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পার্বত জেলার ফার্সে এলাকায় নদীর ভাঙনে ৬৭টি বাড়ি পুরোপুরি ভেসে গেছে এবং আরও বেশ কিছু ঘর ঝুঁকিতে রয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।
মানাং জেলাতেও বন্যা ও ভূমিধসে বাড়িঘর, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহেও সমস্যা হচ্ছে।
এরই মধ্যে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের অংশ ধসে নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর একটি পাহাড়ি ঢাল কালী গণ্ডকী নদীতে ধসে পড়ার দৃশ্য ভিডিওতে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে স্থানীয়ভাবে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়।
এবারের অধিকাংশ ভূমিধসের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে টানা ভারী বৃষ্টিপাতকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও বন্যা ও ভূমিধসের পেছনে সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির কথা জানিয়েছে। ফলে এটিকে সরাসরি হিমবাহ ধসজনিত দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক হবে না।
তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে হিমালয়ের পরিবর্তিত জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির সঙ্গে এসব ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা ICIMOD-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের ক্ষয়, তুষার ও পারমাফ্রস্টের পরিবর্তন পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা কমিয়ে ভূমিধস, হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা এবং অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
হিমবাহ-সম্পর্কিত দুর্যোগের পরও বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা USGS-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই ঘটনায় হিমবাহ-সম্পৃক্ত ঢাল ধস থেকে ধ্বংসাবশেষ ও পানির প্রবল স্রোত তৈরি হয়েছিল। তবে ঘটনাটির সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ে তখনও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন চলছিল।
হিমালয় অঞ্চলের যেকোনো বড় নদীভিত্তিক দুর্যোগের প্রভাব নিম্নাঞ্চলের দেশগুলোতেও পড়তে পারে। ICIMOD বলছে, হিমবাহ গলে নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি বা পুরোনো হ্রদ বড় হলে সেগুলোর বাঁধ ভেঙে আকস্মিক পানি নেমে আসার ঝুঁকি বাড়ে। এ ধরনের Glacial Lake Outburst Flood বা GLOF সীমান্ত পেরিয়ে নিম্নাঞ্চলের নদী অববাহিকায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ হিমালয়-উৎসারিত নদীগুলোর নিম্নপ্রবাহের দেশ হওয়ায় আঞ্চলিক নদী ব্যবস্থার বড় পরিবর্তন, আকস্মিক বন্যা বা অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের ঝুঁকি নিয়ে নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমান নেপালের এই ভূমিধস থেকে বাংলাদেশে সরাসরি ভয়াবহ বন্যা আসন্ন—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এ ধরনের আশঙ্কাকে সম্ভাব্য আঞ্চলিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা উচিত, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নয়।
বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলো হিমালয় অঞ্চলে আগাম সতর্কতা, হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ এবং আন্তঃদেশীয় তথ্য বিনিময় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
সূত্র: নেপালের Rising Nepal, Onlinekhabar, The Kathmandu Post, Reuters, USGS এবং ICIMOD-এর প্রকাশিত তথ্য।