
নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রযুক্তি ডেস্ক
বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওয়েবসাইট আবার চালু করা হয়েছে। ওয়েবসাইটে সম্ভাব্য নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ব্যাংকের ডিজিটাল লেনদেন স্বাভাবিক ছিল বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২৬ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা যাচাইয়ের পর বাংলাদেশ ব্যাংক এবং কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইট পুনরায় চালু করে। এর আগে বহুল ব্যবহৃত ওয়েব প্রোগ্রামিং ভাষা PHP-এর দুটি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সতর্কতা জারি হয়েছিল।
ওয়েবসাইট ও অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে PHP ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই ভাষার কিছু সংস্করণে শনাক্ত হওয়া নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে আক্রমণকারীরা সংশ্লিষ্ট সার্ভারে অননুমোদিত কোড চালানোর সুযোগ পেতে পারে। এতে তথ্য চুরি, সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ হারানো কিংবা অনলাইন সেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা BGD e-GOV CIRT ২২ অক্টোবর PHP-সংক্রান্ত নিরাপত্তা সতর্কতা প্রকাশ করে। সতর্কবার্তায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সার্ভারে ব্যবহৃত PHP সংস্করণ পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা আপডেট স্থাপন এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপের জন্য সার্ভার লগ পর্যালোচনার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক ২২ অক্টোবর তাদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে অফলাইনে রাখে। পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা যাচাইয়ের পর ২৫ অক্টোবর সকাল ৮টায় ওয়েবসাইটটি আবার চালু করা হয়।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক এবং বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের ওয়েবসাইট পুনরায় চালু করা হয়।
তবে সব ব্যাংকের ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা যাচাই ও পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া একই সময়ে সম্পন্ন হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ ঘোষণা ও ওয়েবসাইটের অবস্থা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ২৫ অক্টোবর বাসসকে জানান, সে সময় কোনো ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি এবং ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রেও তাৎক্ষণিক ঝুঁকি ছিল না। ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলেও ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন স্বাভাবিক ছিল বলে জানানো হয়।
ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে না পারা এবং ব্যাংকের লেনদেনব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য দেখার ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও তার পেমেন্ট, ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা অন্যান্য সেবা পৃথক ব্যবস্থায় চালু থাকতে পারে। তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
BGD e-GOV CIRT-এর ২৫ অক্টোবরের সতর্কবার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশে সরকারি, জনসেবা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ইন্টারনেট-সংযুক্ত ওয়েব অ্যাপে পুরোনো, সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ অথবা সমর্থনহীন PHP সংস্করণ ব্যবহারের বিষয়টি শনাক্ত করা হয়েছে। সব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত:
সার্ভারে ব্যবহৃত PHP সংস্করণ ও সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার পরীক্ষা করা।
ঝুঁকিপূর্ণ সংস্করণের জন্য প্রকাশিত নিরাপত্তা আপডেট স্থাপন করা।
সমর্থনহীন সফটওয়্যারকে সমর্থিত সংস্করণে স্থানান্তর করা।
সন্দেহজনক লগইন, অননুমোদিত ফাইল পরিবর্তন ও অস্বাভাবিক সার্ভার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপদ ব্যাকআপ রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সেবা পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা।
শুধু PHP ব্যবহার করলেই কোনো ওয়েবসাইট আক্রান্ত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। প্রকৃত ঝুঁকি নির্ভর করে ব্যবহৃত সংস্করণ, নিরাপত্তা প্যাচ, সার্ভারের কনফিগারেশন এবং সংশ্লিষ্ট সিস্টেম ইন্টারনেটে কতটা উন্মুক্ত তার ওপর।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখিয়েছে, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও অনলাইন সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট, সার্ভার পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত সতর্কবার্তা বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ওয়েবসাইট পুনরায় চালু করাই যথেষ্ট নয়; নিরাপত্তা দুর্বলতা সংশোধন হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ২৫ অক্টোবর ২০২৬; দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২৬ অক্টোবর ২০২৬; BGD e-GOV CIRT-এর PHP নিরাপত্তা সতর্কবার্তা, ২২ ও ২৫ অক্টোবর ২০২৬।