ঢাকা, ২০ আগস্ট ২০২৬: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেখল বাংলাদেশ। জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন। ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর প্রায় তিন ঘণ্টা ভোট চলে এবং বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়। পরে ভোট গণনা শেষে মির্জা ফখরুলকে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণত জাতীয় সংসদে হয়ে থাকে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী না থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল। এরপর প্রায় ৩৫ বছর পর এবার আবারও একাধিক প্রার্থী হওয়ায় সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন।
এবার রাষ্ট্রপতি পদে দুটি মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়ায় ভোটের প্রয়োজন হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তাঁর বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় শেষ পর্যন্ত ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
ভোটের হিসাব
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয় সংসদের মোট ৩৪৯ জন ভোটার ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৪৯টি ব্যালট পেপার প্রস্তুত করা হলেও ভোট দেওয়া হয়েছে ৩৪৩টি। অর্থাৎ ছয়জন সংসদ সদস্য ভোট দেননি।
ভোট গণনা শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট এবং অলি আহমদ ৮৮ ভোট পান। ফলে মির্জা ফখরুল ১৬৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
নির্বাচন কমিশনের ফল ঘোষণার পরই তাঁকে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। পরে নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে গেজেটও প্রকাশ করে।
কে এই মির্জা ফখরুল?
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ সালে তিনি দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান এবং ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন।
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে দলটির গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক চাপের সময় তিনি দলের প্রকাশ্য নেতৃত্বে সক্রিয় ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হলো। দলীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ থেকে তিনি এখন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর একটিতে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নতুন দায়িত্ব
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান এবং সংবিধান অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। যদিও সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ ক্ষমতা সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক প্রকৃতির, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক কার্যক্রমে এই পদটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
বিশেষ করে সরকার গঠন, সংসদ, বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা রয়েছে। ফলে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
শপথ ২১ আগস্ট
নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ জানিয়েছেন, শুক্রবার ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠিত হবে। শপথের পর আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শপথ অনুষ্ঠানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করে এবং দলটির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর পরপরই রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিবের নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি সংসদীয় ভোট হওয়ায় এবারের নির্বাচন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দিক থেকেও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ধারার পর এবার দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোট হওয়াকে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামনে কী?
শপথ গ্রহণের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকেও সরে আসার বিষয়টি সামনে আসবে। বিএনপির মহাসচিব পদে তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন—এ নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২৫৫ ভোটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, বড় ব্যবধানে বিজয় এবং পরদিন শপথ—সব মিলিয়ে ২০ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দেশ বাংলা টিভি ডেস্ক