আজকের দিনটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বৈশ্বিক অঙ্গনে এক অসাধারণ ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একই সাথে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে যা আগামী দিনের ডিজিটাল বাণিজ্য, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে। সকাল থেকেই প্রযুক্তি বিশ্বের নজর ছিল সুইজারল্যান্ডের জেনেভার দিকে, যেখানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আয়োজন করেছে তাদের বিশেষ দিন World Trade and Tech Day।
এবারের আয়োজনের মূল ভাবনা রাখা হয়েছে কিভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে বাস্তব অগ্রগতিতে রূপান্তর করা যায়। এই আলোচনায় উঠে আসছে কিভাবে এআই ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও সহজ এবং সবার জন্য উন্মুক্ত করা যায়, কিভাবে ছোট উদ্যোক্তারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করতে পারে এবং একই সাথে ডেটার নিরাপদ ও অবাধ প্রবাহ কিভাবে নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমাদের আইসিটি রপ্তানি এবং ফ্রিল্যান্সিং অর্থনীতি এই বৈশ্বিক নীতির উপর সরাসরি নির্ভরশীল।
জেনেভায় যখন নীতি নির্ধারণী আলোচনা চলছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা শহরে শুরু হয়েছে নিরাপত্তা প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী। জর্জিয়া ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস সেন্টারে আজ থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন আগামী কয়েকদিন ধরে চলবে। এবারের প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর ফিজিক্যাল সিকিউরিটি। আগে যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা শুধু ভিডিও ধারণ করত, এখন সেই ভিডিও নিজেই বুদ্ধিমত্তার সাথে বিশ্লেষণ করতে পারছে।
সিলিকন ভ্যালির প্রতিষ্ঠান আলফা ভিশন এমন একটি প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে যেখানে তাদের তৈরি এআই এজেন্ট ভিডিও ফুটেজ দেখে নিজেই বুঝতে পারে কোথায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, কোথায় অস্বাভাবিক ভিড় জমছে বা কেউ সন্দেহজনক আচরণ করছে কিনা। এই প্রযুক্তি ব্যাংক, বিমানবন্দর এবং স্মার্ট সিটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ যখন ক্যাশলেস সমাজ এবং স্মার্ট নগরায়নের দিকে এগোচ্ছে, তখন এই ধরনের প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
এই দুটি আশাব্যঞ্জক খবরের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগৎ থেকে আজ একটি গভীর উদ্বেগের খবরও এসেছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী প্রকাশ্যে সব বড় এআই কোম্পানিকে তাদের মডেল উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন আমরা যে গতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা বাড়াচ্ছি, সমাজ সেই প্রযুক্তির ঝুঁকি সামলানোর জন্য মানসিকভাবে এবং প্রযুক্তিগতভাবে প্রস্তুত হওয়ার সময় পাচ্ছে না।
এই কারণে তিনি একটি সমন্বিত কাঠামোর প্রস্তাব করেছেন যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়নকারী থাকবে, বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা মান নিয়ে সমন্বয় হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা গড়ে উঠবে।
এই বক্তব্যের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে একই দিনে ওপেনএআই ঘোষণা দিয়েছে তারা চলতি বছরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে তাদের বহুল প্রতীক্ষিত আইপিও আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি থ্রেট রিপোর্টে দেখা গেছে এআই এজেন্ট নিজে থেকেই বাইরের সিস্টেম হ্যাক করার চেষ্টা করেছে, যা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দিনের আরেকটি বড় চমক এসেছে চিপ শিল্প থেকে। এআই চিপ নিয়ে কাজ করা নতুন স্টার্টআপ ডি-ম্যাট্রিক্স ঘোষণা দিয়েছে তারা এনভিডিয়ার অত্যাধুনিক চিপ সংযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। এর ফলে তাদের তৈরি নতুন র্যাপ্টর চিপ সরাসরি এনভিডিয়ার ডেটা সেন্টার সার্ভারে বসানো যাবে।
এই ঘোষণার গুরুত্ব অনেক। এতদিন এআই-এর লড়াই ছিল কিভাবে বড় মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় তা নিয়ে, এখন লড়াইটা চলে এসেছে সেই প্রশিক্ষিত মডেলকে কত দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় তা নিয়ে। আমরা যখন চ্যাটবটে প্রশ্ন করি বা কোডিং সহকারী ব্যবহার করি, তখন প্রতিটি সেকেন্ডের বিলম্ব বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। ডি-ম্যাট্রিক্সের এই চিপ সেই বিলম্ব কমানোর জন্যই তৈরি।
মাত্র দুই বছর আগে যাত্রা শুরু করা এই স্টার্টআপটি ইতিমধ্যেই বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে এবং এনভিডিয়ার মতো জায়ান্টের সাথে হাত মেলানো তাদের জন্য একটি বড় স্বীকৃতি।
সব মিলিয়ে আজকের এই চারটি ঘটনা একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে প্রযুক্তির দুনিয়া এখন আর শুধু আবিষ্কারের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং সেই আবিষ্কারকে কিভাবে নিরাপদ, বাণিজ্য উপযোগী এবং মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়, সেই পরিণত আলোচনার দিকে এগোচ্ছে।
দেশ বাংলা টিভি ডেস্ক