রিমন সিদ্দিকী, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি:
কারও মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার জন্য সবসময় অর্থের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় একটি ভালো মন আর অন্যের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা। সেই মানবিকতারই অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে প্রায় ৩৫ বছর ধরে মানুষের চুল কেটে দিচ্ছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রনজিতেশ্বর গ্রামের আবেদ তেলি। বিনিময়ে নেন না কোনো পারিশ্রমিক।
বিশেষ করে দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষদের কাছে আবেদ যেন আপনজন। অর্থের অভাবে যারা সেলুনে গিয়ে চুল কাটাতে পারেন না, তাদের জন্য নিজের সময় ও শ্রম উজাড় করে দেন তিনি।
একটি শিশুর কান্না থেকেই শুরু
আবেদের এই মানবিক কাজের শুরু প্রায় ৩৫ বছর আগে। একদিন এক স্কুলছাত্র কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাছে আসে। স্কুলে শিক্ষক তার চুল ধরে টেনেছিলেন। কারণ, চুল ছিল বড় ও অপরিচ্ছন্ন।
শিশুটিকে জিজ্ঞেস করে আবেদ জানতে পারেন, চুল কাটানোর মতো টাকা তার কাছে নেই। এমনকি তার বাবার কাছেও সেই মুহূর্তে টাকা ছিল না।
শিশুটির কষ্ট দেখে আবেদের মনে দাগ কাটে ঘটনাটি। নিজের উদ্যোগে তার চুল কেটে দেন তিনি। সেই ঘটনার পর থেকেই অসচ্ছল মানুষের চুল বিনামূল্যে কেটে দেওয়ার কাজ শুরু করেন।
আবেদ বলেন, এক ছেলে স্কুলে গেছিল। তার শিক্ষক চুল ধরে টেনেছিলেন। সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে আসে। পরে জানতে পারি, চুল কাটানোর টাকা তার ও তার বাবার কাছে নেই। তখন আমি নিজেই তার চুল কেটে দিই। সেই থেকে মানুষের চুল কেটে যাচ্ছি।
নেই আধুনিক সরঞ্জাম, অভিজ্ঞতাই তাঁর ভরসা
চুল কাটার জন্য আবেদের নেই আধুনিক কোনো আয়োজন। সাধারণ কিছু উপকরণ দিয়েই তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে আসছেন। বছরের পর বছর মানুষের চুল কাটতে কাটতে তাঁর হাতে তৈরি হয়েছে নিজস্ব দক্ষতা।
প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জনের চুল কেটে দেন তিনি। কেউ নিজের পছন্দের ধরন জানালে সেভাবেই চুল কাটার চেষ্টা করেন।
দরিদ্র মানুষ, দিনমজুর কিংবা অর্থকষ্টে থাকা অনেকেই তাঁর কাছে নিয়মিত আসেন। তাঁদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
আবেদের নিজের জীবনও অভাবমুক্ত নয়। সংসার চালাতে তাঁর রয়েছে ছোট একটি দোকান। পাশাপাশি সাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ফলদ গাছে ওষুধ দেওয়ার কাজ করেন। এসব কাজ থেকে পাওয়া আয় দিয়েই চলে তাঁর সংসার।
তারপরও মানুষের জন্য বিনামূল্যে চুল কাটার কাজটি বন্ধ করেননি তিনি। নিজের প্রয়োজনের কথা না ভেবে অন্যের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়াটাই যেন তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
শুধু চুল কেটে দেওয়াই নয়, পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়েও মানুষকে সচেতন করেন আবেদ। কারও চুল বড় বা অপরিচ্ছন্ন দেখলে নিজ থেকেই চুল কাটার কথা বলেন।
সময়মতো চুল ও নখ কাটার প্রয়োজনীয়তা বোঝান। তাঁর বিশ্বাস, পরিচ্ছন্ন থাকলে মানুষ নিজেও ভালো অনুভব করে, অন্যের কাছেও সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়।
আবেদের ভাষায়, অপরিষ্কার মানুষ দেখতে ভালো লাগে না। ঝাঁকড়া-বাঁকড়া চুলও ভালো লাগে না। মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখলে আমার মন ভালো হয়ে যায়।
আবেদের কাছে নিয়মিত চুল কাটান আহসান হাবীব হাসান। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই কোনো টাকা ছাড়া আবেদ দাদার কাছে চুল কাটাই।
শাহ আলম সরকার বলেন, টাকার অভাবে চুল কাটাতে না পারলে উনিই আমার শেষ ভরসা।
স্থানীয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন বলেন, অভাবের মধ্যেও অন্যের উপকার করার যে মানসিকতা আবেদ তেলির রয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সমাজে এমন উদ্যোগকে আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
কুড়িগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা ববিতা খাতুন বলেন, নিজের সময় ও শ্রম দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আবেদ তেলির মতো মানুষের এই উদ্যোগ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
প্রায় ৩৫ বছর ধরে নীরবে মানুষের সেবা করে চলেছেন আবেদ তেলি। তাঁর নিজের জীবনেও রয়েছে অভাব-অনটন, কিন্তু অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
কেউ চুল কাটিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্বস্তির হাসি হাসলে সেটিই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় পাওয়া।
রাজারহাটের প্রত্যন্ত গ্রামের আবেদ তাই শুধু একজন চুল কাটার কারিগর নন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বড় কোনো সামর্থ্যের প্রয়োজন নেই। সামান্য শ্রম, একটু সময় আর একটি মানবিক হৃদয় দিয়েও একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারেন অন্যের ভরসার জায়গা।
টাকা নয় মানুষের মুখের হাসিকেই পারিশ্রমিক মনে করে ৩৫ বছর ধরে নীরবে মানবিকতার এই কাজ করে যাচ্ছেন আবেদ তেলি।
দেশ বাংলা টিভি ডেক্স