দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সময় সোমবার সকালে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকশ মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেকে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা USGS জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.৪ এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল কলম্বিয়ার চোকো বিভাগের San José del Palmar এলাকার প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ১০৭ কিলোমিটার। স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটের দিকে শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়।
ভূমিকম্পের কম্পন রাজধানী বোগোতা ছাড়াও কালি, মেডেলিন ও মানিজালেসসহ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় অনুভূত হয়। পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহরে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি Cali। সেখানে বেশ কয়েকটি ভবন ও হাসপাতালের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতালের কিছু অংশ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় রোগীদের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। Reuters-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কালি শহরেই অন্তত ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে Pereira শহরে অন্তত ৬৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি চোকো এলাকাতেও প্রাণহানি ঘটেছে।
দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। মঙ্গলবারও উদ্ধারকর্মী, নিরাপত্তা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের সন্ধান করছেন। কোথাও কোথাও রাতভর উদ্ধারকাজ চালানো হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধারের আশায় উদ্ধারকারীরা বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন।
ভূমিকম্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক বাসিন্দা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বাড়িঘর ছেড়ে বাইরে অবস্থান করছেন। দুর্গত এলাকাগুলোতে লুটপাট ঠেকাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। Reuters জানিয়েছে, কালি ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন এবং কিছু এলাকায় কারফিউ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে দেশটির ১,৬০০-এর বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ৬১টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে বলে জানা গেছে। তবে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।
কলম্বিয়ার সরকার ইতোমধ্যে দুর্গত এলাকাগুলোতে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। উদ্ধার অভিযানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবেও সহযোগিতার প্রস্তাব এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে এবং জরুরি সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ভূমিকম্পকে কলম্বিয়ার একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চল অতীতেও বড় ধরনের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবারের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা এবং প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিতদের উদ্ধারের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে উদ্ধারকারীরা এখনো আশাবাদী। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে খাবার, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কলম্বিয়ার এই ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বর্তমানে অন্তত ১৬৪ জন, তবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় সংখ্যাটি পরিবর্তিত হতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসক, নিরাপত্তা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা একযোগে কাজ করছেন।
দেশ বাংলা টিভি ডেস্ক